মুনতাহার নীরব কান্না

 লেখক: এস আর আশিক মাহমুদ

চ্যাপটার ১:অন্ধকারের শুরু

মুনতাহা ছিল পরিবারের আদরের মেয়ে। সবার প্রিয় এই মেয়েটি সবার মনে সুখের আলো জ্বালিয়ে রাখত। পড়াশোনায় সে মেধাবী ছিল, আর তার মধ্যে একটি সহজ সরল মিষ্টি ভাব ছিল যা তাকে সকলের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। মুনতাহার পড়াশোনার জন্য তার বাবা-মা যখন প্রাইভেট টিউটরের সন্ধান করছিলেন, তখন তাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকায় মার্জিয়াকে বেছে নেন। মার্জিয়া মুনতাহার চেয়ে কয়েক বছরের বড়, পড়াশোনায় তেমন ভালো না হলেও তার আচার-ব্যবহার বেশ সৌম্য এবং হাসিখুশি ছিল। প্রথম দিকে মার্জিয়া মুনতাহার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতো, তাকে বিভিন্ন বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার কথা বলতো এবং দরকার হলে তাকে বাইরে ঘুরতেও নিয়ে যেত।

মুনতাহার মা-বাবা মার্জিয়াকে নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। মার্জিয়া পড়ানোর বিনিময়ে মাত্র ২৫০ টাকা নিত, আর তার ব্যবহারের মাধুর্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই মধুরতার আড়ালে একটা অদ্ভুত অসন্তুষ্টি জমে উঠতে শুরু করেছিল মার্জিয়ার মনে। যখনই সে মুনতাহার পরনের কাপড় বা নতুন কেনা ব্যাগের দিকে তাকাত, তখন তার নিজের মধ্যে একটা অপূর্ণতার অনুভূতি কাজ করত। ধীরে ধীরে তার মনে এমন একটা ভাব জন্মায় যে মুনতাহা তার থেকে সব দিক থেকেই উন্নত।

একদিন এই হিংসা আর অপূর্ণতা তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে নিজেকে সে সামলাতে পারল না। এক বিকেলে, যখন মুনতাহা পড়তে এসেছিল, সে বাথরুমে গেলে মার্জিয়া আলমারির ভেতর রাখা মুনতাহার নতুন পোশাকগুলো দেখতে থাকে। পোশাকগুলো তার খুব পছন্দ হয়, মনে হয় যদি সে এগুলো নিতে পারতো! নিজের লোভকে সামলাতে না পেরে সে আলমারির ভেতর থেকে একটি শাড়ি এবং কয়েকটি ছোটখাটো জিনিস চুপি চুপি ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সময় মুনতাহার বাবা ঘরে এসে পড়েন। তিনি মার্জিয়ার ব্যাগের ভেতর পোশাকগুলো দেখতে পান। তিনি কিছু না বলে শুধু মার্জিয়ার দিকে এমনভাবে তাকান যা তার সবার সামনে তার অপমানের শাস্তি।

মুনতাহার বাবা পরের দিন থেকেই মার্জিয়াকে পড়াতে আসা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। মুনতাহা জানে না কেন তার বাবা এভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু মার্জিয়ার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার। সেই দিনের অপমান মার্জিয়ার মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। সে মুনতাহাকে কেন্দ্র করেই তার ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে রাখে। তার মনে হয়, মুনতাহা তার থেকে সব দিক থেকেই এগিয়ে এবং সে তার জীবনকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দিল।

প্রতিশোধের পরিকল্পনা

মার্জিয়া এই অপমানের ক্ষত বুকে নিয়ে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করতে শুরু করে। প্রথমে তার মনে হলো, সে মুনতাহার সাথে সম্পর্ক ঠিক করে আবার তার সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব রাখবে। কিন্তু প্রতিদিন এই চিন্তা বদলে এক ভয়ানক প্রতিশোধের পথে তার মনকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। তার মা ছিলেন কিছুটা রক্ষণশীল এবং অহংকারী মনের। মেয়ের এমন মনোভাব দেখে তিনিও তাকে উসকে দেন এবং মুনতাহার পরিবারের প্রতি নিজের বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি প্রকাশ করেন। মা-মেয়ে মিলে এমন এক পরিকল্পনা করতে থাকে, যার মাধ্যমে তারা মুনতাহার জীবনে চিরকালের জন্যে অন্ধকার নামিয়ে আনতে পারবে।

মার্জিয়া খুঁজে খুঁজে একটি সুযোগ বের করে। মুনতাহাকে সে একদিন বাড়ির বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাবে। এই পরিকল্পনাটি বেশ জটিল, কারণ মুনতাহা এখন আর তাকে তেমন বিশ্বাস করতে চায় না। মার্জিয়া ঠিক করে মুনতাহাকে কথা বলে ফুঁসলিয়ে একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখানে মুনতাহার আর্তনাদও কেউ শুনতে পাবে না। মার্জিয়া এবং তার মা দীর্ঘদিন ধরে এই পরিকল্পনা আঁটতে থাকে।

ঘটনার সূত্রপাত

একদিন মার্জিয়া মুনতাহাকে ফোন করে বলে, সে নাকি তার কাছে ক্ষমা চায় এবং তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা মিটিয়ে ফেলতে চায়। মুনতাহা প্রথমে ইতস্তত করে, কিন্তু তার বাবার কাছে বিষয়টি বলে যখন অনুমতি নেয়, তখন তার বাবা তাকে বলে সাবধানে থাকতে। মুনতাহা মার্জিয়ার কথা বিশ্বাস করে এবং তাকে দেখতে রাজি হয়। সেই নির্দিষ্ট দিনে মার্জিয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী মুনতাহাকে নির্জন জায়গায় নিয়ে যায়। মুনতাহার মনের কোণে সন্দেহ থাকলেও মার্জিয়ার হাসি আর চেহারার ভান দেখে সে সব ভুলে যায়।

মার্জিয়া মুনতাহার উপর যেই আস্থা অর্জন করে, সেটি তার জন্য মৃত্যুকূপের দিকে যাওয়ার পথকে প্রশস্ত করে তোলে। মার্জিয়া এক সময় মুনতাহাকে এমন জায়গায় নিয়ে আসে যেখানে আগে থেকেই তার মা অপেক্ষা করছিল। সেখানে তারা মুনতাহাকে শক্ত হাতে ধরে ফেলে, আর মুনতাহার চিৎকার করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

শেষে শুরু হয় অন্ধকারের

মুনতাহা যখন বুঝতে পারে যে তাকে প্রতারণার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়েছে, তখন খুব দেরি হয়ে গেছে। মার্জিয়া এবং তার মা মিলে মুনতাহার শরীরের উপর নির্মম আঘাত হানতে থাকে, যেন তাদের মনের প্রতিটি জেদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মুনতাহার শেষ মুহূর্তের আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে যায়, কিন্তু সেই নিঃশব্দ কান্নাগুলো তার মতো সরল মনের মেয়ে থেকে কেড়ে নেয়।

মার্জিয়া ও তার মা মুনতাহার দেহকে পুঁতে ফেলার পরিকল্পনা করে এবং সেই অনুযায়ী রাতে বাড়ির পিছনের খালে গিয়ে তা লুকিয়ে ফেলে। তাদের মনে হয় তারা নিরাপদে সবকিছু সমাধান করেছে। কিন্তু এই ঘটনাই ছিল এক অন্ধকারের শুরু, যা তাদের জীবনে ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।

উপসংহার

মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার খবরে আশপাশের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পুলিশ তদন্তে নামে, সাংবাদিকেরা আসে, আর সবাই মিলে মুনতাহার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। মার্জিয়া তার মনের ভেতর অন্ধকারের এক ভয়ানক অধ্যায়ের সূচনা করে, যা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

চ্যাপটার ২:নিখোঁজ মেয়েটির ছায়া

মুনতাহার নিখোঁজ হওয়া ছিল একটি অন্ধকার দুঃখজনক ঘটনা, যা গ্রামের প্রত্যেকটি মানুষের মনে গভীর আঘাত দিয়েছিল। সে ছিল হাস্যোজ্জ্বল, প্রতিভাবান, আর সবার প্রিয় একটি মেয়ে। তার মা-বাবা, ভাইবোন, সহপাঠীরা এবং আত্মীয়স্বজন—সবাই জানতো, মুনতাহা আর নেই, যেন একটি হাসির ঝলক হারিয়ে গেছে, একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। মুনতাহার পরিবার প্রথমে ভেবেছিল, সে হয়তো কোথাও ঘুরতে গিয়েছে বা বন্ধুদের সাথে কোথাও বেরিয়েছে। কিন্তু দিন গড়িয়ে গেল, এবং মুনতাহার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। তাদের আশা ক্রমশ ফিকে হয়ে গেল, আর তা এক ভয়ের রূপ নিল।

একটি নিঃশব্দ চিঁচিঁর আওয়াজ

মুনতাহার মা, সুমি আক্তার, প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো মুনতাহা তার নতুন বন্ধুদের সাথে কোথাও বেড়াতে গিয়েছে। সে তো এমনিই একটু মুডি, মাঝে মাঝে একা থাকতে পছন্দ করতো। তবে তার মা চুপচাপ মনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করছিলেন। কোনো খবর না পেয়ে সুমি আক্তার সবার আগে মুনতাহার প্রাইভেট টিউটর মার্জিয়ার সাথে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু মার্জিয়া তাকে আশ্বস্ত করল যে, মুনতাহার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই এবং সে জানে না মুনতাহা কোথায়। সুমি আক্তারের মনে অস্থিরতা বেড়ে গেল।

মুনতাহার বাবা, ইশতিয়াক হোসেন, প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে মুনতাহার নিখোঁজ হওয়া এবং তার ফোনে বারবার ফোন করার পর, তার মনে সন্দেহ জাগে। তারা পুলিশে রিপোর্ট করেন এবং অনুসন্ধান শুরু হয়।

পুলিশের তদন্ত শুরু

কানাইঘাট থানার পুলিশ পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে শুরু করল। মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার খবর দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমেই গ্রামবাসী, বন্ধু-বান্ধব, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবাই মুনতাহার খোঁজে বের হয়ে পড়েন। পুলিশ মুনতাহার স্কুলের সহপাঠীদের, বন্ধুবান্ধবীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, কারণ মুনতাহা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে কাউকে কিছু বলেনি। মুনতাহার ফোনের লোগইনে ধীরে ধীরে একটি অদ্ভুত রহস্য দেখা গেল।

মুনতাহার ফোনে কিছু মেসেজ ছিল যেগুলি মার্জিয়ার সাথে ছিল। প্রথমে তারা মনে করেছিলেন, হয়তো মার্জিয়া একটি দুষ্টুমির কারণে মুনতাহাকে কোথাও নিয়ে গেছে। তবে তদন্তের গভীরতায় গিয়ে পুলিশ আরও কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করল। মুনতাহার ফোনের লগস তখনই সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিল। কিছু মেসেজ ছিল যা অস্বাভাবিকভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল। মার্জিয়ার সাথে মুনতাহার শেষবার কোথায় কথা হয়েছিল বা কোথায় দেখা হয়েছিল, তা পরিষ্কার না হওয়ায় পুলিশ মুনতাহার ফোনে থাকা সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে।

এক সাংবাদিকের আগমন

একদিন রাতে SBD নিউজের সাংবাদিক ভাই কিশোরী ত্রিপাঠি ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি মুনতাহার পরিবার এবং মার্জিয়ার পরিবারসহ অন্যদের সাথে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রথমে, মুনতাহার পরিবার একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তবে কিশোরী তাদের উদ্বেগকে সমর্থন দেন এবং তার পেশাদারিত্বের মাধ্যমে তাদের আস্থাশীল করেন। তিনি মুনতাহার খোঁজে মাঠে নেমে পড়লেন এবং দ্রুত গ্রামবাসীদের থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। তিনি মার্জিয়ার সাথে সম্পর্কিত সন্দেহগুলোকে খতিয়ে দেখতে থাকেন, বিশেষ করে মার্জিয়ার আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা খেয়াল করেন। মার্জিয়া বলছিল, "মুনতাহা তো আমার ভালো বন্ধু, সে কোথাও চলে গেলো, এতদিন কি আর কিছু হবে?" তার কথায় এক ধরনের অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা ভাব ছিল। সাংবাদিক কিশোরী ত্রিপাঠি এসবের পেছনের কিছু গোপন বিষয় অনুভব করলেন, কিন্তু তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। তবে তার মনে হচ্ছিল, কিছু গোপন রূপকথা চলছে যা এখনো মুলত প্রকাশ পায়নি।

কানাইঘাট থানা পুলিশ আসছে

সাংবাদিকের তদন্তের পরই পুলিশের সন্দেহ আরো বাড়ে। মার্জিয়া কিছু অস্বাভাবিক আচরণ করছিল, এবং সে প্রায় সবসময় একাই ছিল, তার মা-ও কোথাও ছিল না। পুলিশ অবশেষে মার্জিয়াকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নেয়। মুনতাহার নিখোঁজের ঘটনায় তার আচরণে সন্দেহের ছায়া ছিল, এবং পুলিশ তাকে একদম নির্ধারিত প্রশ্ন করল। প্রথমে মার্জিয়া কথাগুলো খুব শান্তভাবে বলছিল, তবে তার ভেতরে যে কিছু গোপন ছিল, তা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। সে বলছিল, "আমি তো জানি না, মুনতাহা কোথায় গিয়েছে, আমার সাথে তো সে কোনোদিন আসত না।"

তবে যখন পুলিশের আরও তীব্র জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল, তখন মার্জিয়া একটু অস্থির হয়ে পড়ে। তার কথাবার্তা আর আচরণে সন্দেহ আরও গভীর হয়। তার মা কোথায় এবং কেন গিয়েছিল, এই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল অস্পষ্ট। পুলিশ তাকে থানায় আটক করে এবং তদন্তে আরো খোঁজ চালায়।

মুনতাহার খোঁজে অন্ধকারের মুখোমুখি

যতক্ষণ না পুলিশ মার্জিয়ার মাকে আটক করতে পারলো, ততক্ষণ মুনতাহার নিখোঁজের রহস্য অন্ধকারেই রয়ে গিয়েছিল। তবে মুনতাহার পরিবারের কাছে তখনও একটি আশা ছিল— তারা বিশ্বাস করছিল, মুনতাহা জীবিত থাকবে, সে কোথাও হারিয়ে গেছে এবং একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু এই বিশ্বাস ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল, কারণ ঘটনার পেছনে যে কিছু গভীর অন্ধকার লুকানো ছিল, তা পুলিশের কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।

মুনতাহার পরিবার জানত, যে কোনো মুহূর্তে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের ধারণা ছিল, কেউ একজন তাদের কাছ থেকে মুনতাহাকে লুকিয়ে রেখেছে, তবে কেন? তারা জানত না, তবে তাদের মনে সন্দেহ ছিল যে মার্জিয়া ও তার মা এর সাথে যুক্ত। পুলিশ এই দুইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সময় যেন থেমে গিয়েছিল, আর মুনতাহা যেন এক পিচ্ছিল ছায়া হয়ে গিয়েছিল।

উপসংহার

এই অধ্যায়ে মুনতাহার নিখোঁজ হওয়া, পুলিশ তদন্ত, এবং সাংবাদিকের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। মুনতাহার পরিবারের উদ্বেগ এবং রহস্যের আঁচ থেকে একটু একটু করে সত্য উদঘাটিত হতে থাকে। তবে এটি ছিল শুধুমাত্র শুরু—এখনো পর্যন্ত মার্জিয়া ও তার মায়ের অন্ধকার রহস্য উন্মোচনের জন্য আরও গভীর তদন্ত বাকি ছিল।

চ্যাপটার ৩:স্বপ্নের বিপরীতে প্রতিশোধ

মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার পর, তার পরিবার থেকে শুরু করে পুরো গ্রামবাসী, প্রতিটি মানুষ এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। মুনতাহার মা, সুমি আক্তার, দিনের পর দিন শোকে কাতর হয়ে চোখের পানিতে ভেসে চলেছিলেন। তবে যখন পুলিশ মুনতাহার মৃতদেহের খোঁজে অভিযান শুরু করল, তখন সুমি আক্তার আর স্থির থাকতে পারেননি। তার মনের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হয়েছিল—মুনতাহা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু সে আশা ছিল নিছক একটা স্বপ্ন, কারণ মুনতাহার মৃত্যুর এক ভয়াবহ সত্য সামনে চলে আসছিল।

প্রথম দেখা মার্জিয়ার

সুমি আক্তার জানতেন না, কিভাবে তার মেয়েটি এত অদ্ভুতভাবে নিখোঁজ হয়ে গেল। পুলিশের তদন্তে প্রথমে মার্জিয়ার নাম সামনে এলো, কিন্তু মা-বাবা ছিলেন অবগত নন মার্জিয়ার আচরণে যে গোপন কোনো কিছু আছে। মার্জিয়া যখন মুনতাহাকে ভালো বন্ধু হিসেবে দাবি করেছিল, তখন সুমি আক্তার তার উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল, কিছু একটা গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। পুলিশ মার্জিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর, সুমি আক্তার বুঝতে পারলেন, মার্জিয়ার ভাবমূর্তি আসলে কিছুটা ভিন্ন ছিল।

মার্জিয়ার প্রতিশোধের এক অন্ধকার পরিকল্পনা ছিল—যে পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুনতাহা। প্রথম দিকে মুনতাহা মার্জিয়াকে ভালো বন্ধু হিসেবে গণ্য করলেও, এক সময় তার মধ্যে কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করেছিল। মার্জিয়া যেভাবে মুনতাহার প্রতি তার আক্রোশ ব্যক্ত করেছিল, তাতে সুমি আক্তার বুঝতে পারেননি। মুনতাহার অদ্ভুত আচরণ, প্রাইভেট পড়ানোর পর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অদৃশ্য ছায়া, সবকিছু মিলে একটা অশনি সংকেতের ইঙ্গিত ছিল।

মুনতাহার হারিয়ে যাওয়ার পর, সুমি আক্তার মার্জিয়ার কাছে গেলেন। তার চোখে ছিল হতাশার আর দীর্ঘশ্বাসের ছায়া। মার্জিয়া তখনও খুব ঠাণ্ডা ছিল। সুমি আক্তার ঠিকঠাকভাবে মার্জিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুই বুঝতে পারলেন না, তবে মার্জিয়া তার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি প্রকাশ করেছিল। তিনি মনে মনে বুঝতে পারলেন, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। মুনতাহার সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।

মুনতাহার হত্যার পরিকল্পনা

মার্জিয়ার মধ্যে এমন এক বিষাক্ত ভাব ছিল যা শুধুমাত্র প্রতিশোধের প্রতি মনোনিবেশ করেছিল। মুনতাহার প্রতি তার ভয়ের অনুভূতি তাকে ক্রমশ আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। মার্জিয়া বুঝতে পারেছিল, সে যতবারই মুনতাহাকে দেখে, ততবারই তার মধ্যে একটা ক্ষোভ বেড়ে যাচ্ছিল। প্রথমে সব কিছু স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু মুনতাহা যখন তার নিজের দক্ষতার ওপর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল, তখন মার্জিয়ার মনোভাব বদলে যায়। হিংসা, অভিমানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পর, মার্জিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, মুনতাহাকে সে নিজের হাতে শেষ করবে।

তার পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম। প্রথমে, সে মুনতাহাকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্ত রাখবে এবং মনের মধ্যে সন্দেহ জাগাতে চেষ্টা করবে। একসময় সে মুনতাহাকে এমনভাবে ফাঁসাবে যাতে তার কোনো উপায় না থাকে। মার্জিয়া জানত, মুনতাহা তার প্রতি ভীষণ আস্থাশীল ছিল, এবং সে যদি একবার ভেতরে প্রবেশ করে, তাহলে সেই বিশ্বাসের ছদ্মবেশে সহজেই তাকে নিজের পরিকল্পনায় ফাঁসাতে পারবে।

মুনতাহার নিখোঁজ হওয়া

মুনতাহা ছিল এক নিরীহ মেয়ে, যার জীবন ছিল স্বপ্নে পূর্ণ। সে স্বপ্ন দেখত নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানোর, ভালোর জন্য সংগ্রাম করার। কিন্তু মার্জিয়ার সেই স্বপ্নের বিপরীতে প্রতিশোধ ছিল এক ভয়াবহ সত্য। মুনতাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মার্জিয়া তাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজের পৈশাচিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে। একদিন, মুনতাহা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মার্জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, তখন মার্জিয়া তার সমস্ত পরিকল্পনা এক ঝটকায় কার্যকর করে। মুনতাহাকে প্রলুব্ধ করে নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মার্জিয়া এবং তার মা মিলে পরিকল্পনাটি সম্পন্ন করেন।

মুনতাহার শেষ মুহূর্তে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া প্রতারণার কথা ভাবছিল, কিন্তু তখনকার মতো কিছু করার সুযোগ তার ছিল না। মার্জিয়া এবং তার মা মুনতাহাকে শেষ করে দেয় এবং তাকে এক অন্ধকারে দাফন করে, যেখান থেকে কোনো আশা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

পুলিশ তদন্তে মার্জিয়ার শেষ অবস্থান

পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যেতে থাকে। সাংবাদিক কিশোরী ত্রিপাঠি মার্জিয়ার সাথে কথোপকথন করতে গিয়ে বুঝতে পারেন, কিছু একটা গোপন ব্যাপার রয়েছে। তদন্তের পর একদিন পুলিশ মার্জিয়া ও তার মায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনে। মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে মার্জিয়া একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল, তার মুখে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। তবে পুলিশ তার অপরাধের ট্রেইল অনুসরণ করে। পরবর্তীতে, মুনতাহার লাশ খালে পুঁতে রেখে মারে।

এটি ছিল মার্জিয়ার প্রতিশোধের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়। তার হৃদয়ে ছিল শুধুমাত্র একটা উদ্দেশ্য—মুনতাহাকে তার জ্বালা মেটানোর জন্য এক চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসা। মার্জিয়া যে তীব্র ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল, তার মধ্যে কোনো মানবিকতা ছিল না। তার মনের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন ছিল, যা মুনতাহার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।

পরিণতি ও উপসংহার

মুনতাহার হত্যাকাণ্ডের পর, তার পরিবার জানত না তারা কী করবে। তাদের মেয়ে, যে তাদের জীবনকে আলো দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিল, সে এখন আর নেই। মুনতাহার মা, সুমি আক্তার, যতই তার মেয়ের লাশের কাছে যেতেন, ততই তার মনের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠত। মুনতাহা তার চিরন্তন ভালোবাসার রূপে ছিল, কিন্তু মার্জিয়া তাকে শুধুমাত্র একটি প্রতিহিংসার পথ হিসেবে দেখেছিল।

এখন সুমি আক্তার জানতেন, তার মেয়ে হারিয়ে গেছে—তবে তার মৃত্যু কেনো ঘটেছিল, সেটা জানার জন্য তিনি একদিন মার্জিয়াকে শাস্তি দেবেন, যার মাধ্যমে পুরো গ্রাম আবার সত্যের কাছে ফিরে আসবে।

এটাই ছিল প্রতিশোধের বিপরীতে একটি স্বপ্নের মৃত্যু, আর সেই মৃত স্বপ্নের পেছনে ছিল এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের কাহিনী।

চ্যাপটার ৪:লাশের সন্ধান

মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার পর সুমি আক্তার এবং ইশতিয়াক হোসেন এক অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবে গিয়েছিলেন। প্রথমদিকে, তারা ভেবেছিলেন মুনতাহা হয়তো কোথাও গিয়ে আছেন, হয়তো কিছুদিনের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। কিন্তু দিন গড়িয়ে গেল, রাতের পর রাত কেটে গেল, মুনতাহা আর ফিরে এল না। আশার কোনো সঙ্কেত পাওয়া গেল না। কিছুই বুঝতে পারছিলেন না সুমি আক্তার। তার চোখের সামনে ঘুরছিল একটাই চিন্তা—তারা কি আদৌ তাকে আর দেখতে পাবেন?

এই যে দীর্ঘ অনিশ্চিত সময়, তার মধ্যে একসময় তারা পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে বাধ্য হন। পুলিশ তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে, অনুসন্ধান শুরু করে। মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার পর, পুলিশ ধারণা করেছিল হয়তো সে আত্মহত্যা করেছে, অথবা কোনো অজানা ঘটনার শিকার হয়েছে। কিন্তু প্রথম দিকে কিছুই পরিষ্কার হয়নি। মুনতাহার পরিবার এবং গ্রামের লোকজন প্রত্যেকেই নানা অনুমান করতে শুরু করেছিলেন—কেউ বলেছিল, সে হয়তো পালিয়ে গিয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেছিল, হয়তো তাকে কেউ অপহরণ করেছে।

তবে একদিন, যখন কিছুদিন পরপরই কোন প্রকার সুনির্দিষ্ট খোঁজ মেলেনি, তখন পুলিশের তদন্ত আরো গভীর হয়ে ওঠে।

তদন্তের মোড়

পুলিশের তদন্তে প্রথমেই মার্জিয়ার নাম উঠে আসে। মার্জিয়া ছিল মুনতাহার প্রাইভেট টিউটর এবং কিছুদিন আগেও তাদের পরিবারের নিকট বন্ধুর মতো ছিল। তবে কিছুদিন ধরে মার্জিয়া এবং মুনতাহার মধ্যে সম্পর্কের মাঝে কিছুটা অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়। মুনতাহা তাকে আর আগের মতো বিশ্বাস করত না। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, মার্জিয়া মুনতাহার প্রতি তেমন কোনো ক্ষোভ বা হিংসা পোষণ করছিল না, কিন্তু পুলিশ তদন্তের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতার কথা বের হয়ে আসে।

মার্জিয়ার আচরণ ছিল অবিশ্বাস্যভাবে শান্ত এবং নিশ্চুপ, তার মুখে যেন কোনো আবেগ ছিল না। সে প্রায়ই মুনতাহার পরিবারের সামনে অদ্ভুতভাবে আচরণ করত। প্রথমে, সুমি আক্তার তাকে খোঁজার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন, কিন্তু সে সোজাসাপ্টা বলেছিল, “মুনতাহা কোথায় গেলো, আমি জানি না।” সুমি আক্তারের চোখে তখন অনেক সন্দেহ ছিল, কিন্তু সে তেমন কিছু বলতে পারছিল না।

পুলিশ মার্জিয়ার মায়েরও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তার মা, ছকিয়া বেগম, একজন শান্ত মনের মহিলা ছিলেন। তবে সেও কিছুটা চুপচাপ ছিল এবং মুনতাহা নিখোঁজ হওয়ার পর সে এক অদ্ভুত রকমের শীতলতা দেখিয়েছিল। পুলিশ তখন বুঝতে পারল যে, কিছু একটা ঠিক নেই। এক পর্যায়ে তারা মার্জিয়া এবং তার মাকে আটক করে, কিন্তু তাদের কাছে কিছু ততক্ষণে স্পষ্ট ছিল না। তাদের সন্দেহ বেড়ে গেল, তবে তারা এখনও সরাসরি কোনো প্রমাণ পায়নি।

লাশের সন্ধান শুরু

তদন্তের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ একাধিক সম্ভাব্য স্থানে মুনতাহার লাশের খোঁজ শুরু করে। প্রথমে তারা খাল, পুকুর, এবং বনের মধ্যে সন্ধান চালিয়েছিল। তবে কোথাও মুনতাহার কোন সঙ্কেত বা আলামত পাওয়া যায়নি। এর পর, পুলিশ ধারণা করতে থাকে, মুনতাহার লাশ কোথাও গভীরভাবে লুকানো হতে পারে। তারা তদন্তে উঠে আসা অন্যান্য সূত্র এবং খবরের ভিত্তিতে আবার খোঁজ শুরু করে।

একদিন গভীর রাতের দিকে, পুলিশ একটি নতুন সূত্র পায়। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে খবর আসে যে, রাত ৩টার দিকে মার্জিয়া এবং তার মা এক অদ্ভুত কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। সেই সময় তারা খাল থেকে মুনতাহার লাশ বের করার জন্য গিয়েছিলেন। সবার চোখে তখন ঝলক ফুটে ওঠে। পুলিশের সন্দেহ ছিল যে, লাশটি কোথাও লুকানো হয়েছে।

কানাইঘাট থানায় অভিযান

পরবর্তী দিন, পুলিশ থানার মাধ্যমে মার্জিয়ার বাড়ির কাছের খালের দিকে অভিযান শুরু করে। তারা একের পর এক জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই এক পুলিশ কর্মকর্তা খালের পাশে কিছু গোলাকার কিছু দেখতে পান। এগুলো দেখে তার সন্দেহ বাড়ে এবং তিনি দ্রুত অন্য কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন। সবাই একসঙ্গে সেখানে পৌঁছালে, তারা খালের কিনারে লাশটি দেখতে পায়। মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার পর, পুলিশ যে লাশটি পেয়েছিল তা ছিল একই মুনতাহার, যাকে সবাই এতদিন খুঁজছিল।

লাশটি খালের মধ্যে ভেসে আসছিল, মুনতাহার গা ভেজা ছিল, তার শরীরটা পুরোপুরি বেঁকে গিয়েছিল। তবে, পুরো শরীরের উপরে কোনো বড় আঘাতের চিহ্ন ছিল না, তবে কিছু ক্ষুদ্র আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল, যা হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এটি ছিল নিশ্চিত যে, তাকে এক ভয়ঙ্কর উপায়ে হত্যা করা হয়েছে, এবং পরে লাশটি এইভাবে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

গ্রামের প্রতিক্রিয়া

পুলিশ মুনতাহার লাশটি উদ্ধার করার পর, পুরো গ্রাম যেন স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, তাদের প্রিয় মুনতাহা আর নেই। তারা সবাই শোকাহত হয়ে গেল। মুনতাহার পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক-শিক্ষিকারা, সবাই শোকে ডুবে গিয়েছিল। গ্রামবাসীরা জানত না তাদের মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর একটি হত্যাকাণ্ড ঘরভর্তি শান্তির মধ্যে ঘটে যাবে।

গ্রামের মানুষ সবার সামনে এক কষ্টদায়ক প্রশ্ন তুলতে লাগল, "কীভাবে এটা সম্ভব হলো?" তারা বুঝতে পারছিল না, কোনো মা তার মেয়ের সঙ্গে এমন ঘৃণিত কাজ কীভাবে করতে পারে। মার্জিয়া, যাকে মুনতাহা বিশ্বাস করেছিল, সে কীভাবে এমন একটি নিষ্ঠুর পরিকল্পনা করতে পারে? মার্জিয়ার প্রতি ক্ষোভ বেড়ে গিয়েছিল, এবং গ্রামবাসীরা সবার সামনে তার কঠিন শাস্তির দাবী জানাতে শুরু করে।

উপসংহার

মুনতাহার লাশের সন্ধান, তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকারীর মুখোশ খুলে যাওয়ার শুরু ছিল। এটি ছিল এক ভীষণ অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু মুনতাহার পরিবারের কাছে, যে ক্ষত তাদের মনের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তা সহজে পূর্ণ হতে ছিল না। তারা শুধু চেয়েছিল, মুনতাহার হত্যাকারীকে তাদের অভিশাপের সম্মুখীন হতে হবে। মুনতাহার জীবন, তার হাসি, তার স্বপ্ন — সবকিছুই এখন একটি অমর স্মৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পরিবারের চোখে তার হারানো কল্পনাকে ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।

এটাই ছিল মুনতাহার লাশের সন্ধান, কিন্তু এই খোঁজের পিছনে যে কষ্ট এবং নির্যাতন ছিল, তা কখনোই সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।

চ্যাপটার ৫:শেষ বিচার

এটি ছিল এক অন্ধকার অধ্যায়ের শেষের শুরু। মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার পর বহুদিন পেরিয়ে গেল, অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখ, অনেক অপেক্ষা, কিন্তু কোনো শান্তি ছিল না। সুমি আক্তার এবং ইশতিয়াক হোসেন, মুনতাহার মা-বাবা, তাদের প্রিয় মেয়েকে হারানোর বেদনা ভুলে চলতে পারছিলেন না। পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল, সময়ের সঙ্গে যাওয়া আসা চলছিল, কিন্তু তাদের জীবনে সময়ের কোনো মানে ছিল না। তাদের সামনে একটাই চ্যালেঞ্জ—মুনতাহার হত্যাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া।

এটাই ছিল তাদের একমাত্র কামনা, একমাত্র শক্তি। মুনতাহা যে শুধু তাদের মেয়ে ছিল না, সে ছিল তাদের জীবনের একমাত্র আলো। তার হাসি, তার কথা, তার শখ — সব কিছুই এখন যেন তাদের মাঝে একটি শূন্যতার আঘাত রেখে গিয়েছিল।

বিচারের দিকে যাত্রা

মুনতাহার হত্যাকাণ্ডের পর, সুমি আক্তার একান্তভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তার মেয়েকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। পুলিশ যখন মার্জিয়া এবং তার মায়ের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করে, তখন অবশেষে মামলা আদালতে চলে যায়। এই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন মার্জিয়া এবং তার মা তাদের অন্ধকার কার্যকলাপের জন্য শাস্তি পেতে যাচ্ছিল। তবে, সুমি আক্তারের মনের মধ্যে যে ক্ষত ছিল, তা কোনো বিচারেই পূর্ণ হওয়ার ছিল না।

আদালতে প্রথম দিকে মার্জিয়া নিজের অপরাধ অস্বীকার করতে থাকে। সে দাবি করেছিল, মুনতাহার তার সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেনি, আর তার মা ছিলেন অসহায়। কিন্তু পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রমাণ উপস্থাপন করে, যা মার্জিয়াকে চুপ থাকতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত মার্জিয়া নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে, এবং তার মা, ছকিয়া বেগমও মার্জিয়ার সঙ্গে একযোগে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে নিশ্চিত হয়।

এটি ছিল সেই সময়, যখন মুনতাহার পরিবার নিজের আঘাতের তীব্রতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল। সুমি আক্তার প্রায় প্রতি দিন আদালতে যেতেন, তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। তার চোখে ছিল নীরব প্রতিশোধের ঝলক। আদালতে বসে সুমি আক্তার একের পর এক অভিযুক্তদের কথা শুনতে লাগলেন, কিন্তু তার মন তখনও উড়ে যাচ্ছিল তার প্রিয় মুনতাহার কাছে। তার পিতার চোখেও ছিল সেই একই যন্ত্রণা, তার প্রতি এক অব্যক্ত দুঃখের ভাব।

মার্জিয়ার শাস্তি

আদালত তার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। মার্জিয়া এবং তার মায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিচারকের ভাষ্য ছিল, "এ ধরনের বর্বরতা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না। একজন নিরীহ, নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া, তার পিতামাতার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া, কোনো সভ্য সমাজে এর স্থান নেই।"

মার্জিয়া, যে কখনো ভাবতে পারেনি, তার প্রতিশোধের দাম এত বড় হতে পারে, তাকে এখন কারাগারে যেতে হচ্ছিল। তার দেহটি যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরা ছিল, কিন্তু তার মন ছিল কাঁপন ধরানো। তার অপরাধের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তার মা, ছকিয়া বেগমকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সহায়তার জন্য দশ বছরের শাস্তি দেওয়া হয়।

বিচার চলাকালে, মুনতাহার বাবা ইশতিয়াক হোসেন এবং মা সুমি আক্তার চুপচাপ বসে ছিলেন। তাদের চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। তারা জানতেন, যে কোনো শাস্তিই তাদের মেয়ের অকাল মৃত্যু ফিরিয়ে আনতে পারবে না, তবে তারা একমাত্র যা চাইছিলেন, তা ছিল ন্যায়বিচার। তারা মুনতাহার হত্যাকারীদের শাস্তি পেতে দেখতে চেয়েছিলেন, যাতে তাদের মেয়ে শান্তিতে থাকতে পারে, এবং তারা কিছুটা হলেও মনের শান্তি পেতে পারে।

মুনতাহার আত্মা ও শান্তি

এটা ছিল সুমি আক্তারের জন্য এক অদ্ভুত মূহুর্ত। তিনি জানতেন যে, তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু সেই হত্যার প্রতিশোধ তার জন্য কোনো পুরস্কারের মতো নয়। তিনি জানতেন, মুনতাহার হারানোর বেদনা কোনো শাস্তির মাধ্যমে মেটানো যাবে না। কিন্তু তারপরও, সুমি আক্তারের চোখে এক নতুন আশা জেগে ওঠে। এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার মেয়ের হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়াই ছিল সঠিক পথ।

বিচারের দিন শেষে, সুমি আক্তার মুনতাহার জন্য একটি ছোটো প্রার্থনা পাঠ করলেন। তার অশ্রুসিক্ত চোখে একটি সান্ত্বনা ছিল—“হে আল্লাহ, মুনতাহার আত্মা শান্তিতে থাকুক। আমি জানি, সে এখন তোমার কাছে, এবং তাকে আর কখনো ক্ষতি করা হবে না। আমি তোমার কাছে দোয়া করি, তার প্রতি শাস্তি যেন পৃথিবীতে দেওয়ার পর, সে চিরকাল শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারে।”

এটি ছিল সুমি আক্তারের অন্তিম শোধ। তার মনে এক ধরনের পূর্ণতা আসছিল, যদিও সে জানত তার মেয়ে আর ফিরে আসবে না। তিনি জানতেন, মুনতাহা ছিল এখন শান্তিতে, এবং পৃথিবীতে কোনো কিছুই তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

সত্যের জয়

মুনতাহার হত্যাকারীদের শাস্তি হলেও, তাদের পরিবার কখনোই শান্তি পায়নি। মৃত্যুর পর, মুনতাহার ছবি আর স্মৃতি তাদের মন থেকে চলে যেতে পারেনি। প্রতিটি দিন তারা তার হাসি, তার মিষ্টি কথা, তার শখ—সব কিছু অনুভব করত। সুমি আক্তার জানতেন, তার মেয়ের শাস্তি এবং সত্যিকার বিচার না পাওয়ার বেদনা কখনোই পূর্ণ হবে না, কিন্তু একটাই শান্তি ছিল—তার মেয়ের আত্মা এখন শান্তিতে থাকবে।

শেষে, সুমি আক্তার তার মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, মুখে একটি সান্ত্বনাময় হাসি নিয়ে বললেন, "আজকের এই দিনে, তোমার আত্মা শান্তিতে বিশ্রাম নেবে। সত্যের জয় হয়েছে, তোমার আত্মার শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।"

এভাবেই শেষ হয় "মুনতাহার নীরব কান্না"—একটি গল্প, যেখানে ন্যায়বিচারের পরিসমাপ্তি ঘটে, কিন্তু যন্ত্রণা এবং শোক কখনোই শেষ হয় না। এটি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা, যেখানে প্রেম, ক্ষোভ, প্রতিশোধ, এবং শেষপর্যন্ত এক শাশ্বত শান্তির সন্ধান ছিল।

প্রিয়ো পাঠক, গল্পটি আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে। আপনার জীবনের সাথে মিল আছে কিনা। কিছু শিখতে পেরেছেন কিনা। অবশ্য কমেন্টে লিকে যাবেন

লেখক: এস আর আশিক মাহমুদ


Post a Comment

0 Comments